ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছে পাঁচ মাস আগে। অথচ সেই বাসেই দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহন চলছিল। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রামে বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ ১৪ জনের প্রাণহানির পর সামনে এসেছে এ তথ্য।
প্রশ্ন উঠেছে, ফিটনেসবিহীন বাসটি কীভাবে মহাসড়কে চলাচল করছিল, কার নজরদারিতে ছিল যানটি? দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। তবে তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি সড়কে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়া এলাকায় বনপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির কাছাকাছি এ দুর্ঘটনা ঘটে। পটুয়াখালী ও বরগুনা থেকে রাজশাহীগামী আরভি স্পেশাল নামের যাত্রীবাহী বাসটির সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে নয়জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
নাটোরের জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নাটোরের নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিনিধি, বনপাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিআরটিএর নাটোরের সহকারী পরিচালক এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নাটোরের উপসহকারী পরিচালক রয়েছেন। কমিটিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ফিটনেস নেই, রুট পারমিট বহাল
নাটোর বিআরটিএ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ১৩ মে। তবে রুট পারমিটের মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত। অর্থাৎ রুট পারমিট বহাল থাকলেও বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না।
ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাসটি কীভাবে যাত্রী নিয়ে মহাসড়কে চলছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যানটির ফিটনেস পরীক্ষা, কাগজপত্র যাচাই এবং নিয়মিত তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন ব্যক্তিরা। দুর্ঘটনার পর পুলিশ সুপার শরীফুল হক ফিটনেসবিহীন যান চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
চালকের আসনে সুপারভাইজার
দুর্ঘটনায় আহত যাত্রী আব্দুস সালামের ভাষ্য, শরীয়তপুরের মোস্তাকপুর এলাকা থেকে কয়েকজন মিলে রাত ৯টার দিকে বাসটিতে ওঠেন তারা। কুষ্টিয়ায় একটি হোটেলে খাওয়ার বিরতি দেওয়া হয়। বিরতির পর বাসের সুপারভাইজার চালকের আসনে বসেন। সে সময় চালক বাসের বনেটের ওপর বসেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক আহত যাত্রী আব্দুর রহমানের অভিযোগ, বাসের নির্ধারিত আসনের বাইরেও অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হয়েছিল। কুষ্টিয়া থেকে বাস ছাড়ার পর সুপারভাইজার বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। যাত্রীরা বারবার নিষেধ করলেও তিনি তাঁদের কথায় কর্ণপাত করেননি বলে দাবি করেন আব্দুর রহমান।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মহাসড়কে অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে বাসটির সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ হয়ে থাকতে পারে। তবে চালকের আসনে কে ছিলেন, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হয়েছিল কি না এবং সংঘর্ষের পেছনে গতি বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। দুর্ঘটনায় বাস ও ট্রাকের চালকও নিহত হয়েছেন।
রামেকে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন আরও ২০ জন
নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় আরও ২০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন ৮ নম্বর ওয়ার্ডে, চারজন ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে, তিনজন ১ নম্বর ওয়ার্ডে এবং একজন করে ২৫ ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন।
৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরা হলেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার জুলফিকার (৪১), চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের শামীম (১৮), রাজশাহীর কাজলার ফজলুর রহমান (৬০), নওগাঁর সাপাহারের নুর (৩২), বরিশালের বাবুগঞ্জের শহিদুল (৩৫), ঝিনাইদহের চিকিৎসক মুশফিক (৩১), তৌহিদ (৪০), রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মজনু (৪০), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ববি (৩০), পটুয়াখালীর নাবিব (১২) ও যশোর সদরের নাদিম (২৪)।
৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সিয়াম (১৭), চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের তামিম (১৭), ঝিনাইদহের জুয়েল কিবরিয়া (৪০) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয়ন (৩১)। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন ডালিম (৩০)।
এ ছাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মাদারীপুরের ইমা (১৮), নার্গিস (৫০) ও পটুয়াখালীর রুবিনা (৪২)। ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন নওগাঁর নিয়ামতপুরের চিরঞ্জিৎ (৩০)।
সরেজমিনে দেখা যায়, রামেক হাসপাতালের ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আহতদের যন্ত্রণা আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। শরীরজুড়ে অসহ্য ব্যথা, চোখেমুখে আতঙ্ক- কেউ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন, কেউ ছটফট করছেন যন্ত্রণায়। দুর্ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি তাড়া করে ফিরছে তাদের। এর সঙ্গে স্বজন হারানোর শোক আর প্রিয়জনের জীবন নিয়ে উৎকণ্ঠা। এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তছনছ করে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন, কেড়ে নিয়েছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চয়তা।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ কালবেলাকে বলেন, নাটোরের সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ২০ জন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যদের চিকিৎসা চলছে। রোগীদের শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন চিকিৎসকরা।
উদ্ধারকাজে স্থানীয়রা, টাকা খোয়া যাওয়ার অভিযোগ
দুর্ঘটনাস্থলের পাশে থাকা উদ্ধারকারী শাহজাহান আলী জানান, ভোর ৪টার দিকে বিকট শব্দ শুনে তারা বাইরে বেরিয়ে আসেন। এরপর বাস ও ট্রাকের দুমড়েমুচড়ে যাওয়া অবস্থা দেখতে পান। ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়রা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। প্রথমে নয়জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বলে জানান তিনি। পরে হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গাড়ির সামনের অংশ কেটে চালক ও সহকারীদের মরদেহ বের করেন।
উদ্ধারকারী গোলাম মোস্তফা জানান, বাসের ভেতরে এক শিশুর মরদেহের পাশে একটি বিদেশি জাতের বিড়ালও মৃত অবস্থায় ছিল। আরেক উদ্ধারকারী আকবর আলীর দাবি, বাসে পাওয়া কিছু টাকা তারা পুলিশের কাছে জমা দিয়েছেন। অন্যদিকে, নিহতদের এক স্বজনের অভিযোগ, শরীয়তপুর থেকে নাটোরে পেঁয়াজ কিনতে আসা ব্যবসায়ীদের কাছে বিপুল পরিমাণ টাকা ছিল, যার কিছু খোয়া গেছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। তবে টাকা খোয়া যাওয়ার অভিযোগের সত্যতা ও পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহত ১৪, পরিচয় শনাক্ত ১২
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় শনাক্তের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলেন, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে বাসচালক মো. সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে মো. আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিদখালী গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাসফিয়া (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহির উদ্দীন মাতবরের ছেলে মো. জুয়েল মাতবর (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ (৩০), ডুবি সাহাপুর গ্রামের জাহান উদ্দীন মোল্লার ছেলে সাহ লাল (৪৬), কাথুরিয়া গ্রামের রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে মো. শাহিন (৩২), ডুবি সাহিবর গ্রামের আরব আলীর ছেলে মো. আব্দুস সামাদ (৭০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিদখালী গ্রামের আজাহার হাওলাদারের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৪৫), ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়িয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে মো. আবু কালাম (৫৬), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদের ছেলে রাসেল (৩৩) এবং ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখোন্দিয়া গ্রামের ওমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার (৩৫)।
নাটোর ২৫০ শয্যার হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মাহাবুবুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার পর আহত নয়জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। গুরুতর অবস্থায় তিনজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকি চারজন সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পুরোনো দুর্ঘটনার পরও প্রশ্ন সড়ক নিরাপত্তায়
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার ও পুলিশ সুপার শরীফুল হক। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক। জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। দুর্ঘটনা রোধে পাবনা-বনপাড়া মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ, সড়কের সংকীর্ণতা ও বিভিন্ন স্থানে বেহাল অবস্থার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এর আগে একই এলাকায় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে শুধু তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা নয়, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশের উন্নয়ন, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ এবং চালকের দায়িত্ব ও যোগ্যতা নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপও জরুরি।
১২ প্রাণহানির এ ঘটনা আবারও সামনে এনেছে সড়ক নিরাপত্তার মৌলিক প্রশ্ন- নিয়ম ভাঙার পর দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সহায়তা পায়; কিন্তু দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ যান শনাক্ত করে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
