অনলাইন ডেস্ক
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কাছে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বা পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দেওয়া ধারণার ভিত্তিতেই এ সংখ্যা জানা গেছে।
গত বুধবার সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বিদেশে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বন্দিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে দূতাবাসগুলোতে চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর ভাষ্য, দণ্ডপ্রাপ্ত প্রবাসীদের বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘নোট ভার্বাল’-এর মাধ্যমে ১৫৮ জন কারাবন্দি বাংলাদেশির বিষয়ে জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেলকে জানিয়েছিল। আগামীর সময়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই বন্দিদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশের বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। চুরির অভিযোগ রয়েছে ৮ শতাংশের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ঘুষ, হয়রানি, অনৈতিক কাজ, জালিয়াতি, আইসিটি আইন লঙ্ঘন ও মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগে আটক রয়েছেন অনেকে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন সিলেটের মোহাম্মদ আলী। নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ না করে অন্যত্র কাজ করার অভিযোগে সাত মাস আগে তাঁকে আটক করে ডিপোর্টেশন সেন্টারে পাঠানো হয়। তাঁর ভাগ্নে কামাল মিয়া জানান, মাঝেমধ্যে কারাগার থেকে ফোন করেন মোহাম্মদ আলী। তবে আইনি জটিলতা নিরসনে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা বুঝতে পারছেন না স্বজনেরা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, সৌদি আরবে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের অভিবাসী শ্রমিকেরা বিচারপ্রক্রিয়ায় নানা বৈষম্যের শিকার হন। দোভাষীর অভাব, আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য না থাকা এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মতো অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের যথাযথ কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি তাদের নজরে আসে।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই ভিয়েনা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী। কনভেনশন অনুযায়ী, বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো নাগরিকের অনুরোধে তাঁর দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর বিধান রয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন। ২০২৫ সালে প্রায় সাড়ে সাত লাখ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। একই সঙ্গে দেশটি বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম বড় উৎস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫৮৪ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির বড় অংশই বিদেশি শ্রমিক বলে দাবি করেছে সংস্থাগুলো।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের পরিচালক ড. সেলিম রেজা প্রবাসী কর্মীদের সৌদি আরবের আইন সম্পর্কে আগেই ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ দূতাবাসে জনবল বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, স্থানীয় আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে প্রবাসীদের অনাকাঙ্ক্ষিত আইনি জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
২০১৩ সালের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ শাখার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং আইনি বিপদে পড়লে কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের এক গবেষণায় সৌদি আরবে দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ শাখায় জনবল, লজিস্টিকস ও আইনি তহবিলের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
ফলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর বিপরীতে সীমিত সক্ষমতা নিয়ে প্রবাসীদের আইনি সহায়তা দেওয়া ও কর্মপরিবেশ তদারক করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদেশে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ, কার্যকর কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহযোগিতা বাড়ানো এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
