শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জনপদ কুমিল্লায় অপরাধপ্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে জেলায় ১২০টি হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক তথ্য সামনে আসার পর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল। গড়ে প্রতি মাসে ১২টির বেশি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি একই সময়ে ৪১৩টি চুরি, ৪০টি ডাকাতি, ১৫টি অপহরণ ও ৩৮টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া ৪৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা জেলার সার্বিক নিরাপত্তার ভঙ্গুর চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
গত কয়েক মাসে সংঘটিত কয়েকটি লোমহর্ষক ঘটনা স্থানীয়দের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২৫ এপ্রিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়িতে আইরিশ হিল হোটেলের পাশের ফুটপাত থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। র্যাবের তথ্যানুযায়ী, গভীর রাতে বাস থেকে নামার পর যাত্রী ও চালকের ছদ্মবেশে থাকা সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের কবле পড়েন তিনি। মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার একপর্যায়ে বাধা দিলে তাকে চলন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়, যেখানে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম এবং সর্বশেষ ৮ অক্টোবর লালমাইয়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন প্রাণ হারায়। এসব ঘটনায় মহাসড়ক ও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশানির্ভর ছিনতাইকারী চক্রের বেপরোয়া উপস্থিতি প্রকাশ পায়।
আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পেছনে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, ছিনতাই, পারিবারিক ও জমিসংক্রান্ত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা এবং আধিপত্য বিস্তারের মতো বিষয়গুলো সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, চাঁদাবাজি ও চুরির অভিযোগও কম নয়। প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের এই জনপদে জেলাজুড়ে পুলিশ সদস্য রয়েছেন মাত্র আড়াই হাজার। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২ হাজার ৬০০ জনের বিপরীতে মাত্র একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন, যা অপরাধ দমনে বড় অন্তরায়।
বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইন বিভাগের প্রধান ড. নায়ীম আলীমুল হায়দার মনে করেন, কুমিল্লার মতো জনবহুল ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কিশোর গ্যাং, অস্ত্রের সহজলভ্যতা, মাদক চোরাচালান, আইন প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রতা এবং সামাজিক নজরদারির অভাব অপরাধ বাড়াচ্ছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আহসান টিটু অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান ও আন্তরিক ভূমিকা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের তৎপরতার কথা তুলে ধরে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) লুৎফুর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সতর্ক রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ১৫ দিনের বিশেষ অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সন্দেহে ২ হাজার ২৯২ জনকে আটক করে যাচাই-বাছাই শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দ্রুত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নগরজুড়ে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
