রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা বাতিল করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সিনেটর। তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের সদস্য রয়েছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকা অবস্থায় মস্কোকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিরোধিতা করে তাঁরা এ দাবি জানিয়েছেন।স্থানীয় সময় রোববার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে সিনেটররা বলেন, রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ করেনি ট্রাম্প প্রশাসন। এ ছাড়া সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কোনো বিবৃতিও জমা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
বিবৃতিতে সিনেটররা আরও বলেন, ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রাশিয়ার হামলা অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তাই অবিলম্বে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হবে।
এই আহ্বানে স্বাক্ষর করেছেন চার রিপাবলিকান সিনেটর—মেইনের সুসান কলিন্স, আলাস্কার লিসা মারকাউস্কি, নর্থ ক্যারোলাইনার থম টিলিস ও ইউটার জন কার্টিস। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট দলের দুই সিনেটর হলেন নিউ হ্যাম্পশায়ারের জিন শাহিন এবং কানেকটিকাটের রিচার্ড ব্লুমেনথাল।রোববার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিনেটর থম টিলিস বলেন, প্রশাসন রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে প্রেসিডেন্ট আইন অনুসরণ করছেন না—এমন যুক্তি তুলে ধরার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, রাশিয়াই যুদ্ধ শুরু করেছে এবং দখল করা ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার করে যুদ্ধ বন্ধ করার সুযোগ দেশটির রয়েছে।
এর আগে শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে তাঁর সমঝোতা হয়েছে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং তার পরপরই আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথা জানান তিনি। পাশাপাশি স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলেও উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের এ ঘোষণায় মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, এর কয়েক সপ্তাহ আগে কংগ্রেসে এমন একটি আইন পাস হয়, যার আওতায় রাশিয়ার তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেওয়া হয় প্রেসিডেন্টকে। তবে রাশিয়ার মোট প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং সেই আমদানি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে—এমন দেশগুলোর জন্য ছাড়ের বিধান রয়েছে।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় রাশিয়া যেন তেল ও গ্যাস বিক্রির আয় ব্যবহার করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই কংগ্রেস এ উদ্যোগ নিয়েছিল। সিনেটরদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে কংগ্রেস স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছিল, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা না করে। তাঁদের মতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধ এবং ন্যাটো মিত্রদের প্রতি হুমকি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত দেশটি থেকে তেল আমদানি না করার বিষয়ে কংগ্রেসের অবস্থান স্পষ্ট। ট্রাম্পের ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা সেই আইনের সরাসরি পরিপন্থী।
তবে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা মার্কিন আইন লঙ্ঘন করবে কি না, সে বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর জন বারাসো বলেছেন, জ্বালানির ব্যয় কমানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন ট্রাম্প। সিবিএসের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রেসিডেন্টকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে গত মাসে কংগ্রেসে পাস হওয়া নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত আইন কার্যকরের জন্য ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান বারাসো। তাঁর মতে, পুতিনের ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ওই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে পেতে সহায়ক হতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের রেকর্ড উচ্চমূল্যের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পেছনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের প্রভাবও রয়েছে। জ্বালানির ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখার প্রশ্নে এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেসের মধ্যে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
