মো. ইমরান হোসাইন, কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)

সমুদ্রের অফুরন্ত সম্পদ আহরণ এবং সুনীল অর্থনীতি বা ‘ব্লু-ইকোনমি’র সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান মেরিন ফিশারিজ একাডেমি।
সমুদ্রবিজ্ঞান, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ও নটিক্যাল সায়েন্সে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিয়ে একাডেমিটি ইতিমধ্যে সামুদ্রিক খাতে বিশ্বস্ত ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে আজকের পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন একাডেমির অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ফাইজ উদ্দিন আহমেদ।
ক্যাপ্টেন ফাইজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছরে একাডেমির আধুনিক সমুদ্রশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের গঠন ও গতিপ্রকৃতি, মৎস্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও চাষ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় জীবনমান সম্পর্কিত নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রেখেছে। এই জ্ঞান বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ ও সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘মেরিন ফিশারিজ একাডেমিকে বিশ্বমানের মেরিটাইম প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার লক্ষ্যে একাডেমির জন্য আবশ্যকীয় ও অদূরভবিষ্যতে বাস্তবায়নযোগ্য স্থাপনা এবং সুবিধার চাহিদা পূরণে বিদ্যমান ১০ দশমিক ৩৩ একর জায়গার ওপর স্থাপত্য অধিদপ্তর একটি যুগোপযোগী মাস্টার প্ল্যানের নকশা প্রণয়ন করেছে। নকশাটি ইতিমধ্যে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হয়েছে। মাস্টার প্ল্যান টিওঅ্যান্ডই-ভুক্তকরণ ও প্রকল্প গ্রহণের জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে।’
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে ১০ নটিক্যাল মাইল ভেতরে, চট্টগ্রাম সদর ঘাটের অপর প্রান্তে মৎস্য বন্দরের ইছানগর এলাকায় ১০ দশমিক ৩৩ একর জায়গা নিয়ে একাডেমিটি গড়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বঙ্গোপসাগরের চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাহাজ ও মাইন অপসারণ করে বন্দরকে ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার রুশ বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিয়েছিল।

বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশের জন্য সুনীল অর্থনীতির যে নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিশেষায়িত ও দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি পূরণ করা। এ জন্য শুরু থেকেই একাডেমিটি মেরিন ক্যাডেটদের আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তুলছে। এখান থেকে উত্তীর্ণ ক্যাডেটরা দেশীয় ফিশিং ভেসেল ও মার্চেন্ট শিপেই নয়, আন্তর্জাতিক নৌবহরেও সুনামের সঙ্গে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন।
মৎস্য সম্পদ আহরণ, আধুনিক ট্রলার পরিচালনা, সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা এবং আধুনিক নেভিগেশন প্রযুক্তিতে ক্যাডেটদের দক্ষ করে তুলতে একাডেমিতে যুক্ত করা হয় অত্যাধুনিক সিমুলেটর, ল্যাবরেটরি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ সুবিধা। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উপায়ে সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের যে লক্ষ্য সরকার নির্ধারণ করেছে, একাডেমির স্নাতকেরাই তার মূল চালিকাশক্তি।
একাডেমির এই অব্যাহত অগ্রগতি কেবল দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও মৎস্য খাতকেই সমৃদ্ধ করছে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে ব্লু-ইকোনমির অবদানকে করছে আরও সুসংহত। সমুদ্র জয়ের পর এখন সমুদ্র জয়ের আসল নায়কদের গড়ে তুলে এক সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে অনন্য অবদান রেখে চলেছে এই একাডেমি।
প্রতিষ্ঠা ও পটভূমি
বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার, সমুদ্রবিজ্ঞান চর্চা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ১৯৭৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর মেরিন ফিশারিজ একাডেমি প্রতিষ্ঠ করা হয়।
জানা যায়, বাংলাদেশ সরকার ট্রলারগুলোর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত করে। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ, সংরক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ এবং এ খাতের জন্য সুদক্ষ মানবসম্পদ তৈরির উদ্দেশ্যে তখন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে একাডেমিটি যাত্রা শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে ১ জুলাই ১৯৯৩ থেকে একাডেমিটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব বাজেটভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী ‘অধ্যক্ষ’ প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী একাডেমির যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে একাডেমিটি সামুদ্রিক খাতে দক্ষ জনশক্তি গঠন ও সুনীল অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
কর্মপরিধি ও শিক্ষা কার্যক্রম
গভীর সমুদ্রগামী মৎস্য আহরণকারী জাহাজ, ট্রলার ও সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজ চালনা, জাহাজের ইঞ্জিন অপারেশন, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্প এবং মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণ শিল্পের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা একাডেমির কর্মপরিধির অন্তর্ভুক্ত। এ লক্ষ্যে একাডেমি প্রি-সি ট্রেনিংসহ স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ ছাড়া সমুদ্রে মৌলিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য আবশ্যকীয় বিষয়ে নৌ-কর্মকর্তা (মেরিন) ও নাবিকদের এনসিলিয়ারি ট্রেনিং দেওয়া হয়। মৎস্য আহরণকারী জাহাজ, ট্রলার ও সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজে নিয়োজিত অফিসারদের সার্টিফিকেট অব কম্পিট্যান্সি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রিফ্রেশার্স কোর্সও রয়েছে। একাডেমির পরিচালিত চার বছর মেয়াদি বিএসসি (অনার্স) কোর্সের ব্যবস্থাও আছে।
এ ছাড়া একাডেমি থেকে এ পর্যন্ত ৪৪তম ব্যাচের ৯৪ জন নারী ক্যাডেটসহ প্রায় ২ হাজার ৩৫৩ জন ক্যাডেট প্রি-সি ট্রেনিং সম্পন্ন করে সনদ পেয়েছেন। ২০১১ সালে ৩২তম ব্যাচ থেকে পুরুষ ক্যাডেটদের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো নারী ক্যাডেটদের ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়।

আইসিটি ও অবকাঠামো
একাডেমির কোর্স কারিকুলামে আইসিটি ও ডিজিটাইজেশন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একাডেমিতে ৪০ ওয়ার্কস্টেশনের আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে মেরিন ওয়ার্কশপ, ইলেকট্রিক্যাল ল্যাব, সিম্যানশিপ ল্যাব, লাইব্রেরি, সুইমিংপুল, সিমুলেটরভিত্তিক প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং ফায়ার ফাইটিং সিমুলেটর।
দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কর্মসংস্থান ও বহুমুখী শিল্প খাতে অবদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে একাডেমি ভূমিকা রাখছে। ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতিতে অবদানের পাশাপাশি ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণেও একাডেমি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদী কর্তৃপক্ষ।
