আজকাল ওয়েবডেস্ক: মাত্র দশ টাকার একটি ছেঁড়া নোটকে কেন্দ্র করে যে অপমান আর লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল চব্বিশ বছরের এক তরতাজা যুবকের প্রাণ। দিল্লির কল্যাণপুরী এলাকায় ফ্লিপকার্ট মিনিটসের ডেলিভারি পার্টনার হিসেবে কাজ করতেন সমীর হুসেন সাইফি। দিনরাত সাইকেল চালিয়ে কষ্ট করে সংসারের খরচ জোগাতেন তিনি। গত ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ একটি পার্সেল ডেলিভারি দিতে গিয়ে গ্রাহকের থেকে টাকা নেওয়ার সময় দেখা যায়, তার মধ্যে একটি দশ টাকার নোট ছেঁড়া। সমীর অত্যন্ত বিনীতভাবে নোটটি বদলে দেওয়ার অনুরোধ করতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, গ্রাহক তাঁকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে, রাজনৈতিক প্রভাবের ভয় দেখায় এবং সকলের সামনে সমীরকে সপাটে তিনটি চড় মারে। আশপাশে বহু মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও সেদিন কেউ ওই যুবকের অপমানে এগিয়ে আসেননি।
সেই লাঞ্ছনা সরাসরি গিয়ে বিঁধেছিল সমীরের আত্মসম্মানে। মৃত্যুর আগে রেকর্ড করা একটি ভিডিওতে তিনি অত্যন্ত ভারী গলায় সেই যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেছিলেন, সাইকেল চালিয়ে সততার সঙ্গে পরিশ্রম করে রুটিরুজির লড়াই করছেন তিনি, অথচ মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পরিবার থেকে আসার কারণে তাঁকে যেভাবে সবার সামনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হল, সেই চড়টি তাঁর গায়ে নয়, সরাসরি মনে লেগেছে। তিনি আরও আক্ষেপ করেন যে প্ল্যাটফর্ম নির্ভর এই সংস্থায় গ্রাহকই সব, ডেলিভারি কর্মীদের সুরক্ষা বা আত্মসম্মানের কোনও স্থান নেই। একই সঙ্গে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও চরম হতাশা প্রকাশ করেছিলেন সমীর। তাঁর মনে হয়েছিল, আর্থিক বা রাজনৈতিক জোর না থাকায় পুলিশ হয়তো তাঁর অভিযোগের কোনও গুরুত্বই দেবে না। ভিডিওটিতে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ন্যায়বিচার না পেলে তিনি চরম পথ বেছে নেবেন।
অপমানের পরের দিনই, অর্থাৎ ৫ অক্টোবর বিষপান করেন সমীর। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ ১৬ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর অবশেষে ২০ অক্টোবর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২২ অক্টোবর ছিল সমীরের পঁচিশতম জন্মদিন। যে দিনটিতে যুবকের জন্মদিন উদযাপনের কথা ছিল, সেই দিনই কান্নায় ভেঙে পড়ে তাঁর পরিবার প্রশ্ন তুলেছে—তাঁরা কি এখন জন্মদিন পালন করবেন, নাকি শোকের বার্ষিকী পালন করবেন?
সমীরের কাকা মহম্মদ শাহিদ সাইফি অভিযোগ তুলেছেন, অভিযোগ জানাতে থানায় গেলেও পুলিশ শুরুতে তৎপরতা দেখায়নি এবং অভিযুক্তদের প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগ রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মেডিক্যাল বোর্ডের মাধ্যমে ময়নাতদন্ত এবং হাসপাতালের সম্পূর্ণ চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজের দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে পূর্ব দিল্লির পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরই এফআইআর দায়ের হয়েছিল এবং ঘটনার তদন্তে নেমে ইতিমধ্যেই মূল দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। তবু সামান্য দশ টাকার নোট নিয়ে শুরু হওয়া এই অহংকার আর চরম অসম্মান শেষ পর্যন্ত এক খেটে খাওয়া যুবকের প্রাণ কেড়ে নিল, যা গিগ কর্মীদের নিরাপত্তা আর সামাজিক অবহেলার বাস্তবকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
