সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর ও পাকিস্তান ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে “মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরে অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস” হিসেবে অভিহিত করেছে।
শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে এমন কথা বলে সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তান ও মিসর।
তারা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ (two-state solution) দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
ইস্তাম্বুলে আলোচনার পর এক যৌথ বিবৃতিতে দেশ চারটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, ইসরায়েলি নীতি বিশ্বজুড়ে অবিচারের অনুভূতিকে আরও গভীর করেছে। তারা ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে তাদের নিজ নিজ দেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তারা অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ, বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অবিলম্বে থামানো এবং গাজায় নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পাশাপাশি অঞ্চলটিতে পুনর্গঠন কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন।
মন্ত্রীরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়া রোধ করতে নতুন করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই সংকট কেবল “আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমেই” সমাধান করা উচিত।
তারা জুন মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং উভয় পক্ষকে একটি স্থায়ী ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের এই আহ্বান এমন এক সময়ে এল, যখন ইয়েমেনভিত্তিক ও ইরান-সমর্থিত হুথিরা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের ওপর হামলা জোরদার করেছে। এছাড়া, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে; কারণ এমন খবর পাওয়া গেছে যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ওপর সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
মন্ত্রীরা হুথি মিলিশিয়াদের কর্মকাণ্ডকে “অগ্রহণযোগ্য উত্তেজনা” হিসেবে অভিহিত করে ইয়েমেন ও সৌদি আরবে বেসামরিক নাগরিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর তাদের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।
তারা সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে, হুথিদের অবিলম্বে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এছাড়া, তারা লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন যে, সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে তা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং তেল, খাদ্য ও সার পরিবহনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে—যার নেতিবাচক প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। মন্ত্রীরা আইনসম্মত আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টিকারী যেকোনো কর্মকাণ্ড প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে “নিরাপদ, সুরক্ষিত ও অবাধ চলাচল দ্রুত এবং পুরোপুরি পুনর্বহাল” করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁরা আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন ও নিরাপত্তা জোরদার করার প্রচেষ্টায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয় অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, বর্তমানের জরুরি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ইস্তাম্বুলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তাঁরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, বিশেষ করে ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁরা সৌদি আরবের বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হুথিদের চালানো হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। পাশাপাশি, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর উপায় এবং হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মানদাব প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
আগস্ট মাসে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালানো হলে তা তিন দেশের বিরুদ্ধেই আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে।
হুথিদের হামলার মুখে থাকা সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবকে রক্ষায় ইসলামাবাদ “সম্ভাব্য সব উপায়” কাজে লাগাবে।
আলোচনাকালে প্রিন্স ফয়সাল ও ইসহাক দার আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করার লক্ষ্যে যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
