বিদেশে একটি দেশের সম্মান গড়ে ওঠে তার নাগরিকদের সততা, পরিশ্রম, মেধা ও অর্জনের মধ্য দিয়ে। সেই সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে প্রবাসীদের লেগে যায় বছরের পর বছর। অথচ কয়েকজন মানুষের অসাধু কর্মকাণ্ড মুহূর্তেই একটি কমিউনিটিকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে পারে। যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার জন্য সমকামী পরিচয়ের মিথ্যা প্রমাণ তৈরি ও বিক্রির অভিযোগে সম্প্রতি যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা ব্রিটিশ বাংলাদেশি সমাজে এমনই এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ ভোরে পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলসহ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালায় যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট বিভাগ। অভিযানে প্রতারণা ও অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তৃতীয় একজনকে আটক করা হয় যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানের সন্দেহে। তদন্তকারীদের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্র বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য সমকামী পরিচয়ের পক্ষে ভুয়া প্রমাণ তৈরির বিনিময়ে জনপ্রতি এক হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার পাউন্ড পর্যন্ত আদায় করছিল।
এই ঘটনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি এলজিবিটি সংগঠন আপনজন (Apanjon) এবং এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ৪২ বছর বয়সী সাজ্জাদ মিয়ার নাম। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের মানুষ। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে যৌন সংখ্যালঘু বাংলাদেশিদের সহায়তা, সামাজিক যোগাযোগ ও আইনি পরামর্শের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে আসছিল। কিন্তু তদন্তকারীদের সন্দেহ, সংগঠনের নাম ও পরিচিতিকে ব্যবহার করে কিছু আশ্রয়প্রার্থীর জন্য এমন প্রমাণ তৈরি করা হয়েছে, যেগুলোর সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। সাজ্জাদ মিয়া অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তবে এই ঘটনা হঠাৎ করে সামনে আসেনি। এর প্রায় ছয় মাস আগে, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, বিবিসি একটি গোপন অনুসন্ধান প্রকাশ করে, যেখানে যুক্তরাজ্যের অভিবাসনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক ধরনের প্রতারণার ব্যবসার চিত্র উঠে আসে। বিবিসির সাংবাদিকেরা নিজেদের পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কয়েকজন অভিবাসন পরামর্শদাতা ও আইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের পরিচয় ছিল এমন শিক্ষার্থী, যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে এবং যাঁরা যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার উপায় খুঁজছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কয়েকজন পরামর্শদাতা তাঁদের সমকামী পরিচয়ে আশ্রয় আবেদন করার পরামর্শ দেন। কেউ তৈরি করে দিতে চান কাল্পনিক ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিবরণ, কেউ সমকামীদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ছবি, আবার কেউ চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহের কৌশল শেখান। একটি আইন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সাত হাজার পাউন্ড পর্যন্ত অর্থের বিনিময়ে এ ধরনের আবেদন তৈরির প্রস্তাব দেন। অন্য একজন দেড় হাজার পাউন্ডে আবেদন পরিচালনা এবং অতিরিক্ত দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ডে সহায়ক প্রমাণ সংগ্রহের কথা বলেন।
বিবিসির অনুসন্ধানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল, প্রতারণার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য জীবনকাহিনি তৈরির চেষ্টা। একজন পরামর্শদাতা গোপন সাংবাদিককে জানান, আশ্রয় আবেদনের সাক্ষাৎকারে কী বলতে হবে, তার বয়ান আগে থেকেই তৈরি করে মুখস্থ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ আবেদনকারীর বক্তব্য, তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা এবং জমা দেওয়া কাগজপত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
অনুসন্ধানে পূর্ব লন্ডনের আরেকটি সংগঠন Worcester LGBT-এর নামও উঠে আসে। বিবিসির সাংবাদিকেরা সংগঠনটির একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন দাবি করেন, উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউই প্রকৃতপক্ষে সমকামী নন। পরবর্তী সময়ে সংগঠনটি বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিবিসি।
হোয়াইটচ্যাপেলের ‘আপনজন’ সংগঠনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ার পেছনে ছিল আশ্রয় আবেদনগুলোর মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক মিল। হোম অফিসের লন্ডন ও দক্ষিণাঞ্চলের অপরাধ তদন্ত বিভাগের আঞ্চলিক প্রধান ক্রিস ফস্টার জানিয়েছেন, আশ্রয় আবেদন যাচাইকারী কর্মকর্তারা প্রথমে কয়েকটি আবেদনে সন্দেহজনক ধরন লক্ষ করেন। এরপর কয়েক মাস ধরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ, কিছু আবেদনকারীর জন্য সংগঠনের সমর্থনপত্র, সমকামী সম্পর্কের দাবি করা ব্যক্তিদের চিঠি এবং সাজানো ছবি সরবরাহ করা হচ্ছিল।
আরও একটি বিষয় তদন্তকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কয়েকজন বাংলাদেশি আবেদনকারী প্রথমে রাজনৈতিক কারণে আশ্রয় চেয়েছিলেন। সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাঁরা যৌন পরিচয়ের কারণে নির্যাতনের আশঙ্কার কথা তুলে নতুন দাবি করেন। একটি ঘটনায় প্রথম আবেদনের প্রায় নয় বছর পর যৌন পরিচয়ের বিষয়টি সামনে আনা হয়। অতীতে কয়েকটি অভিবাসন মামলায় আপনজনের দেওয়া প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিচারকেরাও প্রশ্ন তুলেছিলেন।
আপনজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শতাধিক পুরোনো ও চলমান আশ্রয় আবেদন পুনরায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা যাচাই করছেন, কোন আবেদনে প্রকৃত তথ্য রয়েছে, কোনটিতে সন্দেহজনক প্রমাণ ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোথাও সংগঠিতভাবে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল কি না।
যুক্তরাজ্যের সরকারি পরিসংখ্যানেও যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদনের একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে এ ধরনের আবেদন হয়েছিল ১ হাজার ৫০২টি। এর মধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আবেদন ছিল ৩২৪টি এবং বাংলাদেশিদের ১৪৮টি। ওই বছর এই শ্রেণিতে পাকিস্তান প্রথম এবং বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ২০২৩ সালে যৌন পরিচয়কে আবেদনের অন্তত একটি ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে ১ হাজার ৩৭৭টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আবেদন ছিল ৫৭৮টি।
২০২৩ সালে যৌন পরিচয় আবেদনের একটি ভিত্তি ছিল, এমন ২ হাজার ১৩৩টি আশ্রয় আবেদন প্রাথমিক পর্যায়ে মঞ্জুর হয়। সংখ্যাটি ওই বছর জমা পড়া আবেদনের সংখ্যার চেয়ে বেশি হওয়ার কারণ, সিদ্ধান্তের মধ্যে আগের বছরগুলোর আবেদনও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০২৫ সালের সামগ্রিক আশ্রয় পরিসংখ্যানেও পাকিস্তান ও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এই দুই দক্ষিণ এশীয় দেশের অনেক আবেদনকারী আগে বৈধ ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, সমকামী পরিচয়ের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়ার আইনি সুযোগ কেন রয়েছে? এর উত্তর পাওয়া যায় ২০১০ সালের ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ে। আদালত সিদ্ধান্ত দেয়, কোনো ব্যক্তি নিজ দেশে যৌন পরিচয়ের কারণে নির্যাতনের বাস্তব ঝুঁকিতে থাকলে তাঁকে পরিচয় গোপন রেখে জীবনযাপনের পরামর্শ দিয়ে আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করা যায় না। অর্থাৎ কেউ নিজের পরিচয় প্রকাশ করলে বিপদের মুখে পড়বেন, অথচ নিরাপদ থাকার জন্য তাঁকে সারাজীবন পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হবে, এমন প্রত্যাশা আইনসম্মত নয়।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। উভয় দেশেই পুরুষদের মধ্যে সমলিঙ্গের যৌন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক আমল থেকে প্রচলিত দণ্ডবিধির বিধান রয়েছে। সামাজিক বৈষম্য, হুমকি ও সহিংসতার ঘটনাও আশ্রয় আবেদন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে। এই আইনি সুরক্ষাকেই প্রতারণার সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি প্রকাশিত হওয়ার পর ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যারা নির্যাতনের মিথ্যা কাহিনি তৈরি করে আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার করছে, তারা প্রকৃত নির্যাতিত মানুষের দুর্দশাকে অবমাননা করছে। তিনি প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে মামলা, অপরাধলব্ধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং অভিবাসন আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এ ধরনের প্রতারণায় দোষী সাব্যস্ত হলে অপরাধের ধরন ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
বাংলাদেশিদের জন্য এই ঘটনা নিঃসন্দেহে বিব্রতকর। যুক্তরাজ্যে কয়েক প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশিরা ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, আইন, সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ব্রিটিশ সমাজের বিভিন্ন স্তরে তাঁদের অবদান রয়েছে। বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী ব্রিটেনের বহুসাংস্কৃতিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দীর্ঘ অর্জনের পাশে যখন অভিবাসন প্রতারণার মতো অভিযোগ সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়, তখন তার সামাজিক অভিঘাত উপেক্ষা করা যায় না।
তথ্যসূত্র: BBC News; The Sun
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::যুক্তরাজ্যে সমকামী পরিচয়ে ভুয়া অ্যাসাইলাম বাংলাদেশিদের ঘিরে প্রতারণার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ first appeared on DesheBideshe.